৪.১ জ্যামিতিক অঙ্কন (Geometric Constructions)
জ্যামিতিক অঙ্কন বলতে পরিক্ষেপক (কম্পাস) এবং সরলরেখা (রুলার) ব্যবহার করে নির্দিষ্ট শর্তাবলী অনুযায়ী জ্যামিতিক চিত্র অঙ্কনকে বোঝায়। এই অধ্যায়ে আমরা বিভিন্ন ধরনের ত্রিভুজ, বৃত্ত, এবং বিশেষ বিন্দুসমূহের (পরিকেন্দ্র, অন্তঃকেন্দ্র ইত্যাদি) অঙ্কন পদ্ধতি শিখব।
অঙ্কনের উপকরণসমূহ
- পরিক্ষেপক (Compass): বৃত্ত বা চাপ অঙ্কনের জন্য ব্যবহৃত হয়। এর দুই পায়ের একটি সূঁচ এবং অন্যটি পেন্সিল/পেন লাগানো থাকে।
- স্কেল (Ruler): সরলরেখা অঙ্কন এবং দৈর্ঘ্য পরিমাপের জন্য।
- পরিগমনী (Protractor): কোণ পরিমাপ ও অঙ্কনের জন্য।
- সেট স্কয়ার (Set Square): সমকোণ এবং সমান্তরাল রেখা অঙ্কনের জন্য।
- ডিভাইডার (Divider): দূরত্ব পরিমাপ এবং স্থানান্তরের জন্য।
মৌলিক অঙ্কনসমূহ
১. নির্দিষ্ট কোণের সমদ্বিখণ্ডক অঙ্কন
দেওয়া আছে: \( \angle BAC \)
অঙ্কন করতে হবে: কোণটির সমদ্বিখণ্ডক
অঙ্কনের ধাপ:
- পরিক্ষেপকের সূঁচ \( A \) বিন্দুতে রেখে যেকোনো ব্যাসার্ধ নিয়ে \( AB \) ও \( AC \) বাহুদ্বয়কে যথাক্রমে \( D \) ও \( E \) বিন্দুতে ছেদ করাও।
- একই ব্যাসার্ধ নিয়ে প্রথমে \( D \) কেন্দ্র করে একটি চাপ অঙ্কন কর।
- অনুরূপভাবে \( E \) কেন্দ্রে পূর্বোক্ত চাপকে \( F \) বিন্দুতে ছেদ করাও।
- \( A \) ও \( F \) বিন্দু যোগ কর। রেখাংশ \( AF \) হলো \( \angle BAC \) এর সমদ্বিখণ্ডক।
২. রেখাংশের লম্বসমদ্বিখণ্ডক অঙ্কন
দেওয়া আছে: রেখাংশ \( AB \)
অঙ্কনের ধাপ:
- পরিক্ষেপকের সূঁচ \( A \) তে রেখে \( \frac{1}{2}AB \) এর চেয়ে বড় ব্যাসার্ধ নিয়ে উপরের দিকে ও নিচের দিকে দুটি চাপ অঙ্কন কর।
- অনুরূপভাবে একই ব্যাসার্ধ নিয়ে সূঁচ \( B \) তে রেখে পূর্বোক্ত চাপদ্বয়কে \( C \) ও \( D \) বিন্দুতে ছেদ করাও।
- \( C \) ও \( D \) বিন্দু যোগ কর। রেখা \( CD \) হলো \( AB \) এর লম্বসমদ্বিখণ্ডক এবং \( AB \) কে \( M \) বিন্দুতে সমদ্বিখণ্ডিত করবে।
প্রমাণ: \( \triangle ACD \cong \triangle BCD \) (SSS) হওয়ায় \( \angle AMC = \angle BMC = 90^\circ \)
৩. বিন্দু হতে রেখার উপর লম্ব অঙ্কন
দেওয়া আছে: রেখা \( AB \) এবং এর বহির্স্থ বিন্দু \( P \)
অঙ্কনের ধাপ:
- পরিক্ষেপকের সূঁচ \( P \) বিন্দুতে রেখে \( AB \) কে দুই বিন্দু \( C \) ও \( D \) এ ছেদ করে এমন একটি চাপ অঙ্কন কর।
- \( C \) ও \( D \) কেন্দ্র করে \( \frac{1}{2}CD \) এর চেয়ে বড় ব্যাসার্ধ নিয়ে দুটি চাপ অঙ্কন কর যা \( Q \) বিন্দুতে ছেদ করবে।
- \( P \) ও \( Q \) যোগ কর। \( PQ \) হলো প্রার্থিত লম্ব।
ত্রিভুজ অঙ্কনের পদ্ধতি
১. তিন বাহু দেওয়া থাকলে (SSS)
দেওয়া আছে: বাহু তিনটি \( a, b, c \) যেখানে \( a+b>c \), \( b+c>a \), \( c+a>b \)
- রেখাংশ \( BC = a \) অঙ্কন কর।
- \( B \) কেন্দ্র করে ব্যাসার্ধ \( c \) নিয়ে একটি চাপ অঙ্কন কর।
- \( C \) কেন্দ্র করে ব্যাসার্ধ \( b \) নিয়ে পূর্বোক্ত চাপকে \( A \) বিন্দুতে ছেদ করাও।
- \( A, B \) এবং \( A, C \) যোগ কর। \( \triangle ABC \) হলো প্রার্থিত ত্রিভুজ।
২. দুই বাহু ও অন্তর্ভুক্ত কোণ দেওয়া থাকলে (SAS)
দেওয়া আছে: \( BC = a \), \( AB = c \), এবং \( \angle B = \theta \)
- \( BC = a \) অঙ্কন কর।
- \( B \) বিন্দুতে \( \angle XBC = \theta \) অঙ্কন কর।
- \( BX \) রেখায় \( BA = c \) নির্ণয় কর।
- \( A \) ও \( C \) যোগ কর।
৩. এক বাহু ও দুই প্রান্তিক কোণ দেওয়া থাকলে (ASA)
দেওয়া আছে: \( BC = a \), \( \angle B = \beta \), \( \angle C = \gamma \) এবং \( \beta + \gamma < 180^\circ \)
- \( BC = a \) অঙ্কন কর।
- \( B \) বিন্দুতে \( \angle XBC = \beta \) এবং \( C \) বিন্দুতে \( \angle YCB = \gamma \) অঙ্কন কর।
- \( BX \) ও \( CY \) রেখাংশ পরস্পরকে \( A \) বিন্দুতে ছেদ করবে।
- \( \triangle ABC \) হলো প্রার্থিত ত্রিভুজ।
৪. সমকোণী ত্রিভুজ অঙ্কন (RHS)
দেওয়া আছে: অতিভুজ \( c \) এবং এক বাহু \( a \) (যেখানে \( a < c \))
- \( BC = a \) অঙ্কন কর।
- \( B \) বিন্দুতে \( BC \) এর উপর লম্ব \( BX \) অঙ্কন কর।
- \( C \) কেন্দ্র করে ব্যাসার্ধ \( c \) নিয়ে \( BX \) কে \( A \) বিন্দুতে ছেদ করাও।
- \( A, C \) যোগ কর। \( \triangle ABC \) হলো প্রার্থিত সমকোণী ত্রিভুজ।
৫. পরিসীমা ও দুই কোণ দেওয়া থাকলে
দেওয়া আছে: পরিসীমা \( 2s \), \( \angle B = \beta \), \( \angle C = \gamma \)
- রেখাংশ \( PQ = 2s \) অঙ্কন কর।
- \( P \) বিন্দুতে \( \angle QPX = \frac{\beta}{2} \) এবং \( Q \) বিন্দুতে \( \angle PQY = \frac{\gamma}{2} \) অঙ্কন কর।
- \( PX \) ও \( QY \) পরস্পরকে \( A \) বিন্দুতে ছেদ করবে।
- \( A \) বিন্দু থেকে \( \angle P \) ও \( \angle Q \) এর সমদ্বিখণ্ডকের সাথে সমান্তরাল রেখা অঙ্কন করে \( PQ \) কে \( B \) ও \( C \) বিন্দুতে ছেদ করাও।
- \( \triangle ABC \) হলো প্রার্থিত ত্রিভুজ।
যৌক্তিকতা: এখানে \( AB = PB \) এবং \( AC = QC \), সুতরাং \( AB+BC+CA = PB+BC+CQ = PQ = 2s \)
বৃত্ত ও ত্রিভুজের বিশেষ বিন্দু অঙ্কন
১. পরিলিখিত বৃত্ত অঙ্কন (পরিকেন্দ্র নির্ণয়)
দেওয়া আছে: \( \triangle ABC \)
অঙ্কনের ধাপ:
- \( AB \) ও \( BC \) বাহুদ্বয়ের লম্বসমদ্বিখণ্ডক অঙ্কন কর।
- এই দুই লম্বসমদ্বিখণ্ডক পরস্পরকে \( O \) বিন্দুতে ছেদ করবে। \( O \) হলো পরিকেন্দ্র।
- \( O \) কেন্দ্র করে \( OA \) বা \( OB \) ব্যাসার্ধ নিয়ে বৃত্ত অঙ্কন কর। এটি \( A, B, C \) তিন বিন্দু দিয়ে যাবে।
২. অন্তর্লিখিত বৃত্ত অঙ্কন (অন্তঃকেন্দ্র নির্ণয়)
দেওয়া আছে: \( \triangle ABC \)
অঙ্কনের ধাপ:
- \( \angle B \) ও \( \angle C \) এর সমদ্বিখণ্ডক অঙ্কন কর।
- এই দুই সমদ্বিখণ্ডক পরস্পরকে \( I \) বিন্দুতে ছেদ করবে। \( I \) হলো অন্তঃকেন্দ্র।
- \( I \) হতে \( BC \) এর উপর লম্ব \( ID \) অঙ্কন কর।
- \( I \) কেন্দ্র করে \( ID \) ব্যাসার্ধ নিয়ে বৃত্ত অঙ্কন কর। এটি তিন বাহুকে স্পর্শ করবে।
৩. বহিঃলিখিত বৃত্ত অঙ্কন
কোনো একটি বাহুর উপর এবং অপর দুই বাহুর বর্ধিতাংশের উপর স্পর্শক বৃত্ত অঙ্কন করতে:
- \( \angle B \) ও \( \angle C \) এর বহিঃসমদ্বিখণ্ডক অঙ্কন কর (যা কোণের বাইরে অবস্থিত)।
- তারা \( I_1 \) বিন্দুতে মিলিত হবে (বাহ্যিক কেন্দ্র)।
- \( I_1 \) থেকে \( BC \) এর উপর লম্ব অঙ্কন করে ব্যাসার্ধ নির্ণয় কর।
৪. নয়-বিন্দু বৃত্ত অঙ্কনের ধারণা
নয়-বিন্দু বৃত্তের কেন্দ্র নির্ণয়ের জন্য লম্ববিন্দু ও পরিকেন্দ্রের সংযোজক রেখার মধ্যবিন্দু নির্ণয় করতে হয় এবং ব্যাসার্ধ \( \frac{R}{2} \) নিয়ে বৃত্ত অঙ্কন করতে হয়।
স্পর্শক অঙ্কন
১. বৃত্তের বহির্স্থ বিন্দু হতে স্পর্শক অঙ্কন
দেওয়া আছে: বৃত্ত \( C(O, r) \) এবং বহির্স্থ বিন্দু \( P \)
অঙ্কনের ধাপ:
- \( O \) ও \( P \) বিন্দু যোগ কর।
- \( OP \) এর মধ্যবিন্দু \( M \) নির্ণয় কর (লম্বসমদ্বিখণ্ডক অঙ্কন করে)।
- \( M \) কেন্দ্র করে \( MO \) বা \( MP \) ব্যাসার্ধ নিয়ে বৃত্ত অঙ্কন কর যা পূর্ববর্তী বৃত্তকে \( A \) ও \( B \) বিন্দুতে ছেদ করবে।
- \( PA \) ও \( PB \) যোগ কর। এগুলোই হলো প্রার্থিত স্পর্শক।
প্রমাণ: \( \angle OAP = 90^\circ \) (অর্ধবৃত্তস্থ কোণ) সুতরাং \( PA \perp OA \), অর্থাৎ \( PA \) স্পর্শক।
২. বৃত্তের পরিধিস্থ বিন্দুতে স্পর্শক অঙ্কন
দেওয়া আছে: বৃত্ত \( C(O, r) \) এবং পরিধিস্থ বিন্দু \( P \)
- \( OP \) ব্যাসার্ধ অঙ্কন কর।
- \( P \) বিন্দুতে \( OP \) এর উপর লম্ব \( PT \) অঙ্কন কর।
- \( PT \) হলো প্রার্থিত স্পর্শক।
৩. দুই বৃত্তের সাধারণ স্পর্শক অঙ্কন
কেন্দ্রগুলোর দূরত্ব \( d \), ব্যাসার্ধ \( r_1 \) ও \( r_2 \):
- অন্তঃস্পর্শক: বড় ব্যাসার্ধ \( (r_1) \) বিশিষ্ট বৃত্তের কেন্দ্রে সমান ব্যাসার্ধ এবং ছোট বৃত্তের কেন্দ্রে \( (r_1 - r_2) \) ব্যাসার্ধ নিয়ে নতুন বৃত্ত অঙ্কন করে স্পর্শক নির্ণয়।
- বহিঃস্পর্শক: একই দিকে \( r_1 \) ও \( r_2 \) যোগ করে অথবা বিপরীত দিকে বিয়োগ করে নতুন বৃত্ত অঙ্কন করে স্পর্শক নির্ণয়।
বিশেষ অঙ্কনসমূহ
১. ভরকেন্দ্র নির্ণয়
- \( BC \) এর মধ্যবিন্দু \( D \) নির্ণয় কর।
- \( A \) ও \( D \) যোগ কর (মধ্যমা)।
- অনুরূপভাবে আরেকটি মধ্যমা \( BE \) অঙ্কন কর।
- \( AD \) ও \( BE \) এর ছেদবিন্দু \( G \) হলো ভরকেন্দ্র।
২. লম্ববিন্দু নির্ণয়
- \( A \) বিন্দু থেকে \( BC \) এর উপর লম্ব অঙ্কন কর।
- \( B \) বিন্দু থেকে \( AC \) এর উপর লম্ব অঙ্কন কর।
- এই দুই লম্ব পরস্পরকে \( H \) বিন্দুতে ছেদ করবে (লম্ববিন্দু)।
৩. সমবাহু ত্রিভুজ অঙ্কন (পরিসীমা দেওয়া থাকলে)
পরিসীমা \( 3a \) হলে প্রতিটি বাহু \( = a \)। সুতরাং SSS পদ্ধতিতে অঙ্কন করা যায়।
৪. নির্দিষ্ট ক্ষেত্রফল বিশিষ্ট ত্রিভুজ অঙ্কন
ক্ষেত্রফল \( \Delta \) এবং ভূমি \( b \) দেওয়া থাকলে, উচ্চতা \( h = \frac{2\Delta}{b} \) নির্ণয় করে \( b \) এর উপর সমান্তরাল রেখা অঙ্কন করে ত্রিভুজ সম্পূর্ণ করা যায়।
অঙ্কনে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র ও কৌশল
- পরিকেন্দ্র অঙ্কন: দুই বাহুর লম্বসমদ্বিখণ্ডকের ছেদবিন্দু। সমকোণী ত্রিভুজের ক্ষেত্রে অতিভুজের মধ্যবিন্দু।
- অন্তঃকেন্দ্র অঙ্কন: দুই কোণের সমদ্বিখণ্ডকের ছেদবিন্দু।
- ভরকেন্দ্র অঙ্কন: দুই মধ্যমার ছেদবিন্দু।
- স্পর্শক অঙ্কন: বহির্স্থ বিন্দু থেকে \( OP \) এর উপর অর্ধবৃত্ত অঙ্কন করে ছেদবিন্দু নির্ণয়।
- ত্রিভুজ অঙ্কনে সতর্কতা: তিন বাহু দেওয়া থাকলে ত্রিভুজ অসমতা \( (a+b>c) \) পূরণ হচ্ছে কিনা পরীক্ষা করতে হবে।
- নির্ভুলতা: পরিক্ষেপকের সূঁচ ও পেন্সিল ঠিকমতো বসানো আছে কিনা এবং চাপ অঙ্কনে কেন্দ্র স্থির আছে কিনা দেখতে হবে।